
বিলাসিতা নাকি প্রয়োজন?
আজকে একটা পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে দেখলাম, একজন মেয়ে বলছেন তিনি একটা জামা একবারের বেশি দুইবার পড়েন না। তা হতে পারে। এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং অন্যকারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই।
কিন্তু আমরা সাধারণ বাংলাদেশিরা কিন্তু আসলে এতোটা ধনী নই যে আমেরিকা বা ইউরোপের মত টিস্যু পেপারের মত একটা পোশাক একবার পড়ে ফেলে দিব বা আর পরবোনা।
কাজেই এই প্রকারের ধনী-টাইপ বক্তব্য কারো কাছে শুনলে, আমার মাথায় প্রথমেই সেই কাজের জন্য ব্যয়িত অর্থের উৎস কি জাতীয় প্রশ্ন মাথায় আসে।
গুটিকয়েক ব্যক্তি ও অনেক সরকারি কর্মকর্তারা অবৈধ উপায়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন, তাদের বাদ দিলে বাকিরা বৈধ উপায়ে যে অর্থ উপার্জন করেন তা দিয়ে বিলাসী জীবন-যাপন করাটা বর্তমান বাজারে অত্যন্ত কঠিন।
আমার নানুর জন্য বিভিন্ন উপলক্ষ্যে নতুন পোশাক কেনা হলে তিনি খুবই বিরক্ত হতেন। শুধু বলতেন তোরা কাপড়ের এত অপচয় করিস কেন!
কেননা তার বক্তব্য হচ্ছে, তাদের সময়কালে কাপড়-চোপরের যথেষ্ট অভাব ছিল, সেই অভিজ্ঞতার ফলে তিনি কাপড়ের অপচয় অপছন্দ করতেন।
গার্মেন্টস শিল্প আমাদের বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। শুধু এজন্য নয় যে, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে গার্মেন্টস শিল্প আমাদের প্রধান খাত; বরং গার্মেন্টস শিল্প আমাদের কাপড়ের অভাব দূর করেছে। এখন চাইলেই আমরা মনের মত জামা পরতে পারি।
বাংলাদেশী জনগন হিসেবে আমরা কিন্তু বেশ দরিদ্র। বেশিরভাগ মানুষই সারা জীবন পার করে দেয় নিজের এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে। কাজেই অনেক কিছুকেই আমরা বিলাসপন্য হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছি। যেমনঃ এয়ার কন্ডিশনার, গাড়ি ইত্যাদি।
কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন যে, এই জিনিসগুলো কিন্তু যতটানা বিলাসী, তারচেয়ে বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয়।
এয়ার কন্ডিশনারকে এক সময় আমি বিলাসী পন্য হিসেবেই গণ্য করতাম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়া যে পরিবর্তন পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে বর্তমানে এয়ার কন্ডিশনারকে আমি আর বিলাসী পন্য হিসেবে গন্য করতে রাজি নই।
কেননা গরমের সময়কালে তাপমাত্রা যে পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তাতে স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকাই দায়। যারা বাইরে কাজ করেন তারাত বটেই, ঘরে যারা থাকেন গরমের কারণে তারাও স্বস্তিতে থাকতে পারেন না। তাছাড়া ভবিষ্যতে তাপমাত্রা কমে যাবে এমন কোন লক্ষণও কিন্তু নেই। বরং তাপমাত্রা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
কাজেই আমার মতামত হচ্ছে, এয়ার কন্ডিশনারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্য হিসেবে গন্য করা এবং এটাকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসা। বা সাধারণ মানুষ যেন সহজেই এয়ার কন্ডিশনার ক্রয় করতে পারে সেই ব্যবস্থা করে দেয়া। সরকারকেই এই উদ্যোগ নিতে হবে।
এতে কি লাভ?
প্রথমত, এই তিব্র গরমে মানুষ একটু স্বস্তি পাবে। তাছাড়া তিব্র গরম থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে রক্ষা করতে পারবে। মূল্য সহনীয় হবার কারণে আরও অনেক বেশি মানুষ এয়ার কন্ডিশনার ক্রয় করবে।
দ্বিতীয়ত, নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য হিসেবে গন্য হবার কারণে দেশেই অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার সুযোগ পাবে। ফলে এই শিল্পের কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি সহ অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
একটি পরিবারে বা সংসারে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পন্য যেমনঃ ওয়াশিং মেশিন, ওভেন সহ আরও অনেক পণ্যের ক্ষেত্রেই একই বক্তব্য প্রযোজ্য।
এবার আসি গাড়ি প্রসঙ্গে, আপনি জানেন কিনা জানি না, বাংলাদেশে যত প্রাইভেট কার আমরা দেখি বেশির ভাগ হচ্ছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। রিকন্ডিশন্ড মানে হচ্ছে কোথাও গাড়িটা আগে ব্যবহার করা হয়েছে। সেকেন্ড হ্যান্ড হিসেবে আমাদের দেশে আসে। আমরা সেই সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়িই আসলে ক্রয় করি।
নতুন গাড়ি বাংলাদেশে আনা হয়না তার জন্য যে কারন গুলো আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ৪০০% আমদানি শুল্ক দিতে হয়। অর্থাৎ গাড়ির ক্রয় মূল্য যদি হয় ১০ লক্ষ টাকা; আপনাকে আমদানি শুল্ক দিতে হবে ৪০ লক্ষ টাকা। কেননা গাড়ি একটি বিলাসী পন্য।
তবে সরকারি মন্ত্রীরা কিন্তু নতুন গাড়ি ব্যবহার করেন। কিভাবে? তাদের বিনা শুল্কে গাড়ি আনার সুযোগ দেয়া হয়। সাধারণ জনগন যেহেতু সরকারি মন্ত্রী নয়, কাজেই এই সুযোগ তাদের হয়না।
কিন্তু লক্ষ্য করুণ, একটা গাড়ি কিন্তু আপনার এবং আপনার পরিবারের দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্যই প্রয়োজন। আমি স্বীকার করছি আমাদের যানজট বা ট্রাফিক সমস্যা আছে। কিন্তু একটা শিল্পের প্রসারের জন্য যানজট সমস্যা কোন বাধা হওয়া উচিৎ না। অন্যভাবে যানজট সমস্যা সমাধানের অনেক উপায় আছে। সেটা নিয়ে অন্য আরেকটা লিখায় লিখব।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা গাড়িকে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবেই দেখি। কোন লোক দেখানো বিষয় হিসেবে নয়।
তাই আমার ব্যক্তিগত মতামত বা চাওয়া হচ্ছে, প্রতিটা পরিবারে যেন একটা প্রাইভেট কার থাকে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এবং গাড়িকেও বিলাসী পণ্য থেকে সরিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্য হিসেবে গন্য করা।
এতে কি লাভ?
প্রথমত, মানুষের যাতায়াতের জন্য নিজের গাড়ি ব্যবহার করবে। এবং প্রতিটা পরিবারে একটা গাড়ি থাকবে।
দ্বিতীয়ত, নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য হিসেবে গন্য হবার কারণে দেশেই অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার সুযোগ পাবে। ফলে এই শিল্পের কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি সহ অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
জাপানিজ বা জার্মানি নয়; বরং বাংলাদেশে উৎপাদিত গাড়িই মানুষ ব্যবহার করতে পারবে।
আমি জানি অনেক সমস্যা আছে বা থাকবে। কিন্তু আসলে কোন সমস্যাই তেমন বড় কোন সমস্যা নয়।
আমার মনে হয়, জনগনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতাই যথেষ্ট।
ধন্যবাদ,
নাজমুল আরেফিন
জেনটালআস্ক
ঢাকা।
Note: Nazmul Arafin is a Writer & Chief Editor of Gentleask (A Project of Invensef Group).
